দুরুদ শরীফ বাংলা উচ্চারণ

ইসলাম ধর্মে রাসূল (সা.) এর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মাধ্যম হলো দুরুদ পাঠ করা। সঠিক দুরুদ শরীফ বাংলা উচ্চারণ সহ জানা থাকলে আমরা দৈনন্দিন জীবনে ইবাদতের সওয়াব আরও নির্ভুলভাবে অর্জন করতে পারি।

সালাত বা নামাজের বাইরেও চলতে-ফিরতে দুরুদ পাঠ করলে মনের প্রশান্তি বাড়ে এবং অভাবনীয় বরকত লাভ করা যায়। এই বরকত অর্জনের জন্য আমাদের প্রতিটি শব্দের সঠিক উচ্চারণ ও অর্থের দিকে বিশেষ নজর দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

আজকের এই ব্লগ পোস্টে আমরা সহজ ভাষায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দুরুদ শেয়ার করছি। আপনি যদি শুদ্ধভাবে দুরুদ শিখতে চান, তবে এই লেখাটি আপনাকে পূর্ণাঙ্গ গাইডলাইন দিয়ে প্রতিটি ধাপে দারুণভাবে সহায়তা করবে।

দুরুদ শরীফ

প্রতিটি মুসলিমের হৃদয়ে নবীজির প্রতি প্রেম থাকা ঈমানের অংশ, আর সেই প্রেম প্রকাশের সর্বোত্তম উপায় হলো দুরুদ শরীফ বাংলা উচ্চারণ বুঝে পাঠ করা। এটি কেবল সওয়াব নয়, বরং মহান আল্লাহর রহমত পাওয়ার অন্যতম মাধ্যম। চলুন, সেরা কিছু দুরুদ শরীফ দেখা যাক।

দরুদ শরীফ (Durud Sharif) কি?

দুরুদ শরীফ মানে সালাম ও আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর সালাম জানানো। এটি আরবী এবং ইসলামী শরীয়তে সালাওয়াত বা একক সালাত নামেও বেশি পরিচিত। দরূদ কোন আরবি বা ইসলামী পরিভাষা নয়।

প্রিয় নবী হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) এঁর উপর দরুদ শরীফ (Durud Sharif) প্রেরণ করার জন্য ইসলামে উৎসাহিত করা সবচেয়ে বড় ইবাদতগুলোর মধ্যে একটি এবং এটি দুনিয়া ও আখেরাতে একজন ব্যক্তির জন্য সবচেয়ে উপকারী ইবাদতগুলোর মধ্যে একটি।

দরুদ শরীফ কত প্রকার?

বিভিন্ন ধরনের দুরুদ শরীফ প্রচলিত আছে, যার মধ্যে কিছু প্রসিদ্ধ দুরুদ শরীফ নিচে উল্লেখ করা হল। তবে নিচের দুরুদ শরীফ ছাড়াও আরো অনেক ধরনের দুরুদ শরীফ প্রচলিত আছে। প্রসিদ্ধ দুরুদ শরীফগুলো হলো—

  1. দরুদে ইব্রাহিম: এটি সবচেয়ে প্রসিদ্ধ দুরুদ শরীফ, যা প্রত্যেক নামাজের শেষ বৈঠকে পাঠ করা হয়।
  2. দরুদে নারিয়া: এটি একটি বিশেষ দুরুদ শরীফ, যা বিভিন্ন বিপদ-আপদ থেকে মুক্তির জন্য পাঠ করা হয়।
  3. দরুদে তাঞ্জিনা: এটিও একটি বিশেষ দুরুদ শরীফ, যা বিভিন্ন বিপদ-আপদ থেকে মুক্তির জন্য পাঠ করা হয়।
  4. সংক্ষিপ্ত দুরুদ: "সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম" (অর্থ: তাঁর উপর আল্লাহর শান্তি বর্ষিত হোক)। এটি নবী (সা.)-এর নাম শোনার পর পাঠ করা হয়।

দুরুদ শরীফ আরবী

اَللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَّعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى إِبْرَاهِيْمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيْمَ إِنَّكَ حَمِيْدٌ مَّجِيْدٌ- اَللَّهُمَّ بَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَّعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا بَارَكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيْمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيْمَ إِنَّكَ حَمِيْدٌ مَّجِيْدٌ

দুরুদ শরীফ বাংলা উচ্চারণ

উচ্চারণ: আল্লহুম্মা ছাল্লি আ'লা মুহাম্মাদিওঁ ওয়া আ'লা আ-লি মুহাম্মাদিন কামা ছাল্লাইতা আ'লা ইব্রাহীমা ওয়া আ'লা আ-লি ইব্রহীমা ইন্নাকা হামীদুম মাজী-দ্। আল্লাহুম্মা বারিক্ আ'লা মুহাম্মাদিওঁ ওয়া আ'লা আ'লি মুহাম্মাদিন, কামা বা-রাকতা আ'লা ইব্রাহীমা ওয়া আ'লা আ'লি ইব্রাহীমা ইন্নাকা হামিদুম মাজীদ।

দুরুদ শরীফ বাংলা অর্থ

অর্থ: হে আল্লাহ, দয়া ও রহমত করুন হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) এর প্রতি এবং তার বংশধরদের প্রতি, যেমন রহমত করেছেন হযরত ইব্রাহীম (আঃ) ও তার বংশধরদের উপর। নিশ্চই আপনি উত্তম গুনের আধার এবং মহান। হে আল্লাহ, বরকত নাযিল করুন হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) এর প্রতি এবং তার বংশধরদের প্রতি, যেমন করেছেন হযরত ইব্রাহীম (আঃ) ও তার বংশধরদের উপর।নিশ্চই আপনি প্রশংসার যোগ্য ও সম্মানের অধিকারী।

দুরুদ শরীফ পড়ার উত্তম সময় কখন?

দুরুদ শরীফ পাঠের জন্য কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই। যেকোনো সময় দুরুদ শরীফ পাঠ করা যায়। তবে কিছু বিশেষ সময় আছে, যখন দুরুদ শরীফ পাঠ করা উত্তম। নিচে সেগুলো উল্লেখ করা হলো—

  • নামাজের মধ্যে: নামাজের শেষ বৈঠকে তাশাহুদের পর দুরুদ শরীফ পাঠ করা সুন্নত। এই আমল আমাদের সকলেরই অভ্যাস করা উচিত।
  • দোয়ার আগে ও পরে: কোনো দোয়া বা মোনাজাতের আগে ও পরে দুরুদ শরীফ পাঠ করলে দোয়া কবুল হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
  • শুক্রবারে: জুমার দিন দুরুদ শরীফ পাঠ করা বিশেষ ফজিলতের কাজ। শুক্রবার এমনিতেই ফজিলত পূর্ণ দিন। এই দিনের দুরুদ পাঠ করা আরো বেশী সওয়াবের কাজ।
  • মসজিদে প্রবেশ ও বের হওয়ার সময়: মসজিদে প্রবেশ ও বের হওয়ার সময় দুরুদ শরীফ পাঠ করা সুন্নত।
  • আজানের পর: আজানের পর দোয়ার আগে দরুদ শরীফ পড়া উত্তম। রাসুল বলেছেন "যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রশংসা ও দরুদ ছাড়া দোয়া করে, তার দোয়া আকাশের ওপর উঠতে পারে না।
  • নবী (সা.) এর নাম শুনলে: নবী (সা.)-এর নাম শুনলে বা উচ্চারণ করলে দুরুদ শরীফ পাঠ করা ওয়াজিব।
  • অন্যান্য সময়: এছাড়াও যেকোনো সময়, বিশেষ করে অবসর সময়ে দুরুদ শরীফ পাঠ করা যায়।

দুরূদ শরীফের ফজিলত কি?

দুরুদ শরীফ পাঠ করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ একটি ইবাদত। এর মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা যায় এবং নবী (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা প্রকাশ পায়। নিচে দুরুদ শরীফের কিছু ফজিলত উল্লেখ করা হলো—
  1. আল্লাহর রহমত লাভ: যে ব্যক্তি নবী (সা.) এর উপর একবার দুরুদ পাঠ করে, আল্লাহ তার উপর দশবার রহমত নাজিল করেন।
  2. গুনাহ মাফ: দুরুদ শরীফ পাঠের মাধ্যমে গুনাহ মাফ হয় এবং মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। কাজেই বেশি বেশি দুরুদ পাঠের মাধ্যমে আমাদের গুনাহ মাফ করে নিতে পারি।
  3. দোয়া কবুল: দুরুদ শরীফ পাঠের মাধ্যমে দোয়া দ্রুত কবুল হয়। দোয়ার আগে ও পরে দুরুদ শরীফ পাঠ করলে দোয়া কবুল হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
  4. শাফায়াত লাভ: কেয়ামতের দিন নবী (সা.) দুরুদ পাঠকারীদের জন্য শাফায়াত করবেন। সুতরাং নবীর শাফায়াত লাভ করার সহজ উপায় হচ্ছে দুরুদ পাঠ।
  5. নবীর নৈকট্য লাভ: কেয়ামতের দিন সেই ব্যক্তি নবীর সবচেয়ে নিকটবর্তী হবে, যে ব্যক্তি নবীর উপর সবচেয়ে বেশি দুরূদ পাঠ করবে।
  6. মানসিক প্রশান্তি: দুরুদ শরীফ পাঠের মাধ্যমে মানসিক প্রশান্তি লাভ করা যায় এবং অন্তর পরিষ্কার হয়।
  7. দারিদ্র্য দূরীকরণ: নিয়মিত দুরুদ শরীফ পাঠ করলে দারিদ্র্য দূর হয় এবং রিজিক বৃদ্ধি পায়। আপনি নিয়মিত দরুদ পাঠ করলে রিজিক নিয়ে দুঃশ্চিন্তা করতে হবে না।
  8. বিপদ থেকে মুক্তি: দুরুদ শরীফ পাঠের মাধ্যমে বিপদ থেকে মুক্তি পাওয়া যায় এবং আল্লাহর সাহায্য লাভ করা যায়।
  9. উচ্চ মর্যাদা লাভ: যে ব্যক্তি নবীর উপর একবার দরুদ পাঠ করে আল্লাহ তার উপর দশটি রহমত নাযিল করেন, তার দশটি গুনাহ ক্ষমা করে দেন এবং দশটি দরজা বুলন্দ করেন।

শেষ কথা

আমাদের প্রিয় নবী সারা জীবন উম্মত উম্মত করে গেছেন। কাজেই সকল মুসলমান ভাই বোনের উচিত নবীজীকে সম্মান জানানো। আর নবীজীকে সম্মান জানানোর সর্বত্তোম মাধ্যম হচ্ছে বেশী করে দুরুদ শরীফ (Durud Sharif) পাঠ করা।

যারা দুরুদ শরীফ শুদ্ধভাবে পড়তে চান, তাদের জন্য বাংলায় উচ্চারণসহ দুরুদ মুখস্থ করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই আসুন, আমরা প্রতিদিন বেশি বেশি দুরুদ শরীফ পাঠ করি এবং আল্লাহর রহমত ও শান্তি লাভ করি। আল্লাহ আমাদের সবাইকে দুরুদ শরীফ পাঠ করার তৌফিক দান করুন, আমিন। 🤲✨


Frequently Asked Questions

দুরুদ শরীফ পাঠ করলে কি দোয়া দ্রুত কবুল হয়?
হ্যাঁ, যেকোনো দোয়া কবুল হওয়ার অন্যতম শর্ত হলো দোয়ার আগে ও পরে দুরুদ শরীফ পাঠ করা। ইসলামি আলেমগণের মতে, যে দোয়ার শুরুতে এবং শেষে দুরুদ নেই, সেই দোয়া আসমান ও জমিনের মাঝে ঝুলে থাকে এবং আল্লাহর দরবারে পৌঁছাতে বাধাগ্রস্ত হয়। তাই নিজের যেকোনো মনের নেক আশা পূরণের জন্য দোয়ার শুরুতে আল্লাহর প্রশংসা এবং রাসূল (সা.)-এর ওপর দুরুদ পাঠ করা অত্যন্ত জরুরি।
দুরুদে ইব্রাহিম পাঠ করার বিশেষ ফজিলত কী?
দুরুদে ইব্রাহিম হলো সেই দুরুদ যা আমরা প্রতিদিন নামাজের শেষ বৈঠকে পাঠ করি। এটি সকল দুরুদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ এবং পরিপূর্ণ। এর ফজিলত অপরিসীম কারণ এটি স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাদের শিখিয়ে দিয়েছেন। এই দুরুদ পাঠ করলে দুনিয়া ও আখিরাতে শান্তি লাভ হয় এবং এটি দোয়া কবুলের জন্য একটি শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। নামাজের বাইরেও জিকির হিসেবে দুরুদে ইব্রাহিম পাঠ করা অত্যন্ত বরকতময়।
সবচেয়ে ছোট ও সহজ দুরুদ শরীফ কোনটি?
যদি কারো হাতে সময় কম থাকে বা দ্রুত আমল করতে চান, তবে সবচাইতে ছোট দুরুদটি হলো— "সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম" (صلى الله عليه وسلم)। এর অর্থ হলো— "আল্লাহর শান্তি ও রহমত তাঁর ওপর বর্ষিত হোক।" এই ছোট বাক্যটি পাঠ করলেও দুরুদ পাঠের সওয়াব পাওয়া যায়। বিশেষ করে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নাম শুনলে বা লিখলে এই সংক্ষিপ্ত দুরুদটি পাঠ করা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য আবশ্যক (ওয়াজিব)।
দুরুদ শরীফ পাঠ করার মূল গুরুত্ব কী?
ইসলামি শরীয়াহ অনুযায়ী দুরুদ শরীফ পাঠ করা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ এবং এটি সরাসরি ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত। দুরুদ শরীফ মূলত হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং তাঁর জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করার একটি বিশেষ মাধ্যম। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা মুমিনদেরকে দুরুদ পাঠ করার নির্দেশ দিয়েছেন। নিয়মিত দুরুদ পাঠ করলে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন হয়, গোনাহ মাফ হয় এবং কিয়ামতের দিন রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর শাফায়াত বা সুপারিশ লাভের পথ সহজ হয়।
জুমার দিনে দুরুদ পাঠের নিয়ম কি?
সপ্তাহের অন্যান্য দিনের তুলনায় জুমার দিন (শুক্রবার) দুরুদ শরীফ পাঠ করার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। হাদিস শরীফে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন যে ব্যক্তি জুমার দিন তাঁর ওপর বেশি বেশি দুরুদ পাঠ করবে, সেই দুরুদ সরাসরি তাঁর কাছে পেশ করা হয়। বিশেষ করে আসরের নামাজের পর থেকে মাগরিব পর্যন্ত সময়টিতে বেশি বেশি দুরুদ পাঠ করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। এটি রিজিক বৃদ্ধি এবং মানসিক প্রশান্তির জন্য একটি পরীক্ষিত আমল।
Next Post Previous Post