দোয়া মাসুরা বাংলা উচ্চারণ

নামাজে শেষ বৈঠকে তাশাহহুদ ও দরুদ পড়ার পর দোয়া মাসুরা বাংলা উচ্চারণসহ পাঠ করা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। রাসূল (সা.) এই দোয়াটি পড়ার বিশেষ তাকিদ দিয়েছেন, যা আমাদের মোনাজাতের গভীরতা ও গুরুত্ব বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

আপনার নামাজের শুদ্ধতা নিশ্চিত করতে এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনার জন্য এই দোয়ার অর্থ জানা জরুরি। আমাদের প্রাত্যহিক ইবাদতে এটি এমন এক শক্তিশালী আবেদন, যা সরাসরি মহান রবের দরবারে কবুল হওয়ার পথ প্রশস্ত করে।

এই পোস্টে আমরা দোয়া মাসুরার সঠিক উচ্চারণ, বাংলা অর্থ এবং এর ফজিলত নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। সহজভাবে দোয়াটি মুখস্থ করতে এবং এর অন্তর্নিহিত ভাবার্থ বুঝতে এই পোস্টটি আপনাকে দারুণভাবে সাহায্য করবে বলে আশা করি।

দোয়া মাসুরা (Dua Masura) কি?

নামাজের শেষ বৈঠকে দোয়া মাসুরা পড়তে হয়। দোয়ায়ে মাসুরা শেষে সালাম ফেরাতে হয়। এখানে পড়ার জন্য নির্দিষ্ট কোনো দোয়া নেই। বরং একটি মাসনুন দোয়া পড়লেই হয়। এমনকি একাধিক দোয়াও পড়া যায়।

হাদিস শরিফে এসেছে, অতঃপর (দরুদ পাঠের পর) যে দোয়া ইচ্ছে, সেটা পড়বে (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৪০২)। অনেকেই মনে করেন দোয়া মাসুরা বলতে শুধু ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি জালামতু’ বুঝায়। আসলে বিষয়টি এমন নয়, বরং যে কোন দোয়াই পড়া যায়।

দোয়া মাসুরা বাংলা উচ্চারণ

اللّٰهُمَّ إِنِّيْ ظَلَمْتُ نَفْسِيْ ظُلْمْاً كَثِيْراً، وَلاَ يَغْفِرُ الذُّنُوْبَ إِلاَّ أَنْتَ، فَاغْفِرْ لِيْ مَغْفِرَةً مِنْ عِنْدِكَ وَارْحَمْنِي، إِنَّكَ أَنْتَ الغَفُوْرُ الرَّحِيْمُ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নি জালামতু নাফসি জুলমান কাসিরা। ওয়ালা ইয়াগ ফিরুজ জুনুবা ইল্লা আনতা। ফাগফির লি, মাগফিরাতাম মিন ইনদিকা; ওয়ার হামনি, ইন্নাকা আনতাল গাফুরুর রাহিম।
অর্থ: হে আল্লাহ! আমি নিজের উপর অনেক জুলুম করেছি। আর আপনি ছাড়া গুনাহ ক্ষমাকারী আর কেউ নেই। আপনি নিজ অনুগ্রহে আমাকে ক্ষমা করুন এবং আমার প্রতি রহম করুন। নিঃসন্দেহে আপনিই ক্ষমাকারী, করুণাময়।

দোয়া মাসুরা পড়ার নিয়ম

আমরা প্রত্যেক নামাজের শেষ বৈঠকে আত্তাহিয়্যাতু এবং দুরূদে ইব্রাহিম পাঠ করার পর দোয়া মাসুরা পড়ি। নামাজে নিয়ত করার পর সানা পড়তে হয়। তারপর বিসমিল্লাহ বলে সূরা ফাতিহা পাঠ করতে হয়। তারপর অন্য যে কোন সূরা পড়তে হয়।

তারপর রুকুতে গিয়ে সুবহান-না রাব্বিয়াল আজিম পাঠ করতে হয়। তারপর রুকু থেকে উঠে সোজা হয়ে দাঁড়াতে হয়। এভাবে যদি দুই রাকাত নামাজ আদায় করা হয়, তাহলে দুই রাকাত পড়ার পর বসে আত্তাহিয়াতু পড়তে হয়। তারপর দুরুদে ইব্রাহিম পড়তে হয়। অতঃপর সালাম ফেরানোর পূর্বে দোয়ায়ে মাসুরা পাঠ করতে হয়।

দোয়ায়ে মাসুরার ফজিলত

প্রতিটি দোয়া আমাদের জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা বলতে পারি দোয়া আমাদের জীবন এবং ইবাদতের সর্বোত্তম কাজকে পরিবর্তন করে। তাই আমরা যখন নামাজ পড়ি, তখন নামাজের মধ্যে যে কোনো দোয়া পাঠ করতে হবে যা স্মরণ হয়।

কারণ নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন দুআ হলো ইবাদতের জীবন। মহানবী মুহাম্মাদ (সাঃ) আমাদেরকে এই দোয়া শিখিয়েছেন যাতে করে আমরা আরো বেশি করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে পারি।

আবদুল্লাহ ইবনে আমর থেকে বর্ণিত যে, হজরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) হুজুরে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললেন, ‘আমাকে এমন কিছু দোয়া বলুন যা দ্বারা আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে পারি।

অতঃপর হুজুরে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই দুআ পাঠ করতে বললেন (সহীহ আল-বুখারী ৬৩২৬)। এই দোয়াটি মুহাম্মাদ (সাঃ) খলিফা হযরত আবু বকর (রাঃ)-কে শিখিয়েছিলেন।

শেষ কথা

প্রতিটি মোনাজাতে দোয়া মাসুরা বাংলা উচ্চারণ সহ পাঠ করলে মনের প্রশান্তি বাড়ে এবং নামাজের একাগ্রতা বৃদ্ধি পায়। নিয়মিত এই আমলটি চর্চা করার মাধ্যমে আপনি আপনার ইবাদতকে আরও বেশি অর্থবহ এবং সুন্দর করে তুলতে পারবেন।

নিয়মিত আমল করলে এটি মুখস্থ করাও সহজ হয়ে যাবে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে এই দোয়াটি বোঝার ও আমল করার তৌফিক দান করুন। আমিন!


Frequently Asked Questions

দোয়া মাসুরা নামাজের কোন অংশে পড়া হয়?
দোয়া মাসুরা নামাজের শেষ বৈঠকে অর্থাৎ দ্বিতীয় সিজদার পর যখন আমরা বসি, তখন পড়তে হয়। তাশাহহুদ (আত্তাহিয়্যাতু) এবং দরুদ শরীফ পড়ার পর এবং সালাম ফেরানোর ঠিক আগে এই দোয়াটি পাঠ করা সুন্নত। এটি মূলত নিজের গুনাহের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়ার একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও আবেগপূর্ণ প্রার্থনা।
দোয়া মাসুরা না জানলে নামাজ কি হবে?
দোয়া মাসুরা পড়া নামাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ 'সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ', এটি ফরজ বা ওয়াজিব নয়। তাই যদি কেউ ভুলবশত এটি না পড়ে বা মুখস্থ না থাকার কারণে বাদ দেয়, তবে তার নামাজ হয়ে যাবে। তবে নামাজের পূর্ণাঙ্গ সওয়াব লাভ এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসরণের জন্য এই দোয়াটি শিখে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। যারা এটি জানেন না, তারা আপাতত অন্য কোনো কোরআনিক দোয়া (যেমন: রাব্বানা আতিনা...) পাঠ করতে পারেন।
দোয়া মাসুরা কি শুধু এক প্রকারের হয়?
'দোয়া মাসুরা' বলতে মূলত সেই সব দোয়াকে বোঝায় যা কোরআন বা হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। আমরা সাধারণত নামাজে যে দোয়াটি (আল্লাহুম্মা ইন্নি জালামতু...) পড়ি সেটিই সর্বাধিক প্রচলিত। তবে এই নির্দিষ্ট দোয়া ছাড়াও হাদিসে বর্ণিত অন্য যেকোনো মাসনুন দোয়া নামাজের শেষ বৈঠকে পাঠ করা যায়। তবে নবী করিম (সা.) যে দোয়াটি শিক্ষা দিয়েছেন, সেটি পাঠ করাই সর্বোত্তম।
দোয়া মাসুরার বাংলা অর্থ ও মর্মার্থ কী?
দোয়া মাসুরার বাংলা অর্থ হলো: "হে আল্লাহ! আমি আমার নিজের ওপর অনেক জুলুম করেছি, আর আপনি ছাড়া গুনাহ মাফ করার কেউ নেই। অতএব আপনি আপনার পক্ষ থেকে আমাকে বিশেষ ক্ষমা প্রদর্শন করুন এবং আমার প্রতি দয়া করুন। নিশ্চয়ই আপনি পরম ক্ষমাশীল ও দয়ালু।" এই দোয়ার মর্মার্থ হলো আল্লাহর অসীম দয়া ও করুণার ওপর পূর্ণ আস্থা রেখে নিজের পাপের জন্য অনুতপ্ত হওয়া।
দোয়া মাসুরা পড়ার ফজিলত কী?
দোয়া মাসুরার বিশেষ ফজিলত হলো এটি সরাসরি নিজের অক্ষমতা প্রকাশ করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়ার মাধ্যম। এই দোয়ার মাধ্যমে বান্দা স্বীকার করে যে সে নিজের ওপর অনেক জুলুম করেছে এবং আল্লাহ ছাড়া ক্ষমা করার আর কেউ নেই। এটি পাঠ করলে অন্তরে নম্রতা আসে এবং নামাজের একাগ্রতা বৃদ্ধি পায়। সহীহ বুখারী ও মুসলিমের বর্ণনা অনুযায়ী, স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা.) হযরত আবু বকর (রা.)-কে নামাজের মধ্যে পড়ার জন্য এই দোয়াটি শিখিয়েছিলেন।
Next Post Previous Post